জবি প্রতিনিধি: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের নবনিযুক্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. আইনুল ইসলামকে ঘিরে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ক্যাম্পাসে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং একদল সাধারণ শিক্ষার্থীর বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত ডিন কার্যালয় ছেড়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ড. আইনুল ইসলামের ভূমিকা বিতর্কিত ছিল। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে তারা "ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন" বলে উল্লেখ করে নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান।
বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে অধ্যাপক আইনুল ইসলাম অর্থনীতি বিভাগের নিজ কক্ষে অবস্থান করছিলেন। এ সময় ছাত্রদল ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীরা সেখানে গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি কক্ষ ছেড়ে চলে যান।
এরপর সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন কার্যালয়ের সামনেও ছাত্রদল, জাতীয় ছাত্রশক্তি ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং দ্রুত তাঁর নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান। একপর্যায়ে ড. আইনুল ইসলাম ডিন কার্যালয় ত্যাগ করেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, জুলাই আন্দোলনের সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। পাশাপাশি অতীতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে তাঁরা বলেন, এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় ছাত্রশক্তি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব শাহিন মিয়া দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনবিরোধী অবস্থান এবং ৩ আগস্ট গণভবনের বৈঠকে অংশগ্রহণের বিষয়ে ড. আইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তিনি সন্তোষজনক জবাব দেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, জুলাইয়ের চেতনার বিপরীতে অবস্থান নেওয়া কারও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে থাকা উচিত নয়।
জবি ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাফর আহমেদ বলেন, জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কর্মসূচি চলছিল। সে সময় আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং আহত শিক্ষার্থীদের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের কাছে এমন একজন শিক্ষককে ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, যাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনবিরোধী অবস্থানের অভিযোগ রয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
ঘটনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, ঘটনার সময় তিনি ক্লাসে ছিলেন। পরে শিক্ষক ও উপাচার্যের কাছ থেকে খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। তিনি বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় অধ্যাপক আইনুল ইসলামকে নিরাপদে ক্যাম্পাস ত্যাগের ব্যবস্থা করা হয় এবং তিনি নিজেই তাঁকে গাড়িতে তুলে দেন।
উল্লেখ্য, অধ্যাপক ড. মো. আইনুল ইসলামকে গত ৭ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ১২ জুলাই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তাঁর নিয়োগের বিরোধিতা করে কয়েকটি ছাত্রসংগঠন উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেয়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ৩ আগস্ট গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশ নেন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরদিন ৪ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে নীল দলের ব্যানারে মানববন্ধনেও অংশ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক জানান, ডিন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগের দিন থেকেই সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন কার্যালয়ে তালা ঝুলছিল। ফলে তিনি সেখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। তাঁদের দাবি, বৃহস্পতিবারের ঘটনাটি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে ঘটেছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
ঘটনার পর জবি ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল আউয়াল বলেন, প্রক্টর ও কয়েকজন শিক্ষক অধ্যাপক আইনুল ইসলামকে নিরাপদে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়েছেন। ভবিষ্যতে তিনি আবার দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখ্য সংগঠক ফেরদৌস শেখ বলেন, জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছেন বলে যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া শিক্ষার্থীদের অনুভূতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই তাঁরা এই নিয়োগের বিরোধিতা অব্যাহত রাখবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

