যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। অভিযোগ করেছেন—ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির উদ্যোগ নেওয়ায় ইসরায়েল সরকারের ভেতরের কিছু সদস্য এবং তাদের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে জনমত গঠনের চেষ্টা করছে।
গত বুধবার জনপ্রিয় মার্কিন পডকাস্টার জো রোগানের সঙ্গে দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স সরাসরি এ অভিযোগ তোলেন। সেখানে তিনি বলেন, “আমি যে চুক্তির জন্য কাজ করছিলাম, সেটিকে ভেস্তে দিতে বিদেশি অর্থায়নে প্রচারণা চালানো হয়েছে।”
‘যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায় কেউ কেউ’
ভ্যান্সের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল সরকারের কিছু অংশ চায় ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকুক। তাই তারা যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ থেকে সরিয়ে দিতে চায়।
তিনি বলেন,
“দেশের জন্য প্রেসিডেন্ট যে আলোচনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, আমি সেটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। আর সেই কারণেই আমার বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালানো হচ্ছে।”
ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকা ভ্যান্স আগেও ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা করেছেন। তবে এবার তাঁর বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্কের ভেতরের অস্বস্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ডিজিটাল প্রচারণা ও ‘মাগা’ রাজনীতি
ভ্যান্স সাক্ষাৎকারে টাইম সাময়িকীর একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করেন। সেখানে দাবি করা হয়, ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনমত প্রভাবিত করতে ইসরায়েলপন্থী একটি প্রচারণা চালানো হয়েছে। এমনকি ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের সাবেক এক ব্যবস্থাপককে এ কাজে যুক্ত করার কথাও উঠে এসেছে।
ওয়াশিংটন থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক প্যাটি কালহেন মনে করেন, এই প্রচারণার মূল লক্ষ্য ছিল ট্রাম্পের ‘মাগা’ (Make America Great Again) সমর্থকদের প্রভাবিত করা। কারণ ইসরায়েল-নীতি নিয়ে রিপাবলিকান ঘরানার ভেতরেই এখন মতভেদ বাড়ছে।
জো রোগানের পডকাস্টে ভ্যান্সের উপস্থিতি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তরুণ ‘মাগা’ সমর্থকদের মধ্যে রোগানের বিশাল প্রভাব রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভ্যান্স সেখানে গিয়ে সরাসরি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন।
‘আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে’
ভ্যান্স দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়ায় ইসরায়েল-সম্পৃক্ত একটি গোষ্ঠী তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণের লক্ষ্য বানিয়েছে।
তবে তিনি এটাও বলেন,
“মিত্র হোক বা প্রতিপক্ষ—সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ইসরায়েলও করে। এতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু উদ্বেগ তখনই, যখন সেই প্রচারণা সত্যিই আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।”
শান্তি চুক্তি ভেঙে পড়ার শঙ্কা
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তি হয়, যার লক্ষ্য ছিল সংঘাত কমানো। ভ্যান্স সেই চুক্তির পক্ষে সরব ছিলেন। কিন্তু ইসরায়েলে এ নিয়ে তীব্র বিরোধিতা রয়েছে।
এদিকে গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বেড়ে যাওয়ায় চুক্তিটি কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স বলেন, ইসরায়েলের প্রভাব না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সর্বশেষ ইরান যুদ্ধে জড়াত না। তবে একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন,
“ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়—এ বিষয়ে প্রেসিডেন্টের মতো আমিও একমত।”
সম্পর্কের নতুন টানাপোড়েন?
ভ্যান্সের বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ভেতরে থাকা নীতিগত বিভাজনকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও কূটনৈতিক সমঝোতার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও সামরিক চাপের কৌশল—এই দ্বন্দ্বই এখন মার্কিন রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে।
প্রশ্ন এখন একটাই—ইরান ইস্যুতে কূটনীতি জিতবে, নাকি আবারও প্রাধান্য পাবে যুদ্ধের ভাষা?

