ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ: আপাতত দিল্লি যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, নেপথ্যে ‘আস্থার সংকট’ ও একাধিক ইস্যু
ঢাকা ও দিল্লি কূটনৈতিক ডেস্ক:
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জাতীয় স্বার্থ এবং দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বহুল আলোচিত ভারত সফর আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, চলতি বছরে এই সফরের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। মূলত দিল্লির পক্ষ থেকে যথাযথ সদিচ্ছার অভাব এবং সাম্প্রতিক কিছু বৈরী আচরণকেই এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
কেন থমকে গেল দিল্লি সফর?
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, একটি রাষ্ট্রপ্রধানের সফরের জন্য যে ধরনের ‘আস্থার পরিবেশ’ প্রয়োজন, বর্তমানে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে তা অনুপস্থিত। সফরের পথে প্রধান বাধা হিসেবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে:
১. গঙ্গা পানি চুক্তি ও দিল্লির নীরবতা: আগামী ডিসেম্বরে ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। বর্তমান চুক্তিটি নবায়ন বা নতুন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থা বজায় রাখার অনুরোধ ঢাকা জানালেও, মোদি সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
২. ‘হাসিনা কার্ড’ ও অস্থিতিশীলতার চেষ্টা: মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে আশ্রয় দিয়ে তাঁকে দিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ানো এবং বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে ঢাকা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। বিশেষ করে, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার যে ঘোষণা রয়টার্সের মাধ্যমে এসেছে, তার পেছনে দিল্লির মদত রয়েছে বলে মনে করছে সরকারের নীতিনির্ধারকরা।
৩. সীমান্তে উত্তেজনা ও উপদেষ্টাকে হেনস্তা: পুশইনের মাধ্যমে সীমান্তে কৃত্রিম উত্তেজনা তৈরি এবং দিল্লিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাকে বিমানবন্দরে হেনস্তা করার ঘটনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের তিক্ততা বাড়িয়ে দিয়েছে।
৪. চীন সফরের প্রতিক্রিয়া: প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফল চীন সফর নিয়ে ভারতের গণমাধ্যম ও থিঙ্কট্যাংকগুলোর নেতিবাচক প্রচারণা এবং ‘দাদাগিরি’ সুলভ আচরণকে ভালো চোখে দেখছে না ঢাকা।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি: ‘সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত’
রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, ভারত ঐতিহাসিকভাবেই আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কাউকে বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত নয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পার না হতেই যেভাবে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের চেষ্টা চলছে, তাতে দিল্লির সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখাই যুক্তিযুক্ত। চীন সফরের মাধ্যমে যে কৌশলগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা রক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে বেশি জরুরি।
বিকল্প গন্তব্য: জাপান, সৌদি আরব ও জাতিসংঘ
দিল্লি সফর পিছিয়ে গেলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক তৎপরতা থেমে নেই। বরং বৈশ্বিক শক্তিসাম্য রক্ষায় তিনি বিকল্প ও প্রভাবশালী দেশগুলোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন:
- জাপান সফর: জাপান সরকার প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত টোকিও সফরে নিতে আগ্রহী। আগামী ১২ আগস্ট ঢাকায় দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এই সফরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হতে পারে।
- সৌদি আরব: যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে সেপ্টেম্বর বা তার কাছাকাছি সময়ে প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরব সফরে যেতে পারেন। এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
- জাতিসংঘ অধিবেশন: সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তাঁর একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে।
কূটনৈতিক বার্তায় ‘কৌশলগত ভারসাম্য’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর যখন অনিশ্চিত, তখন জাপান ও সৌদি আরব সফর হবে বাংলাদেশের জন্য এক বড় ধরনের কৌশলগত বিজয়। ভারত আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হলেও, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থের বিনিময়ে কোনো আপস করতে রাজি নয় বর্তমান সরকার।
সব মিলিয়ে, দিল্লি যদি তাদের ‘চাপ প্রয়োগের নীতি’ ও ‘হাসিনা তোষণ’ বন্ধ না করে, তবে নিকট ভবিষ্যতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বরফ গলার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

