বিচারের নামে প্রহসন: ৮ বছরের শিশুর কান্নার দাম ২০ হাজার টাকা! ওলামা দল নেতার সালিসে তুলকালাম
বাগেরহাট প্রতিনিধি:
শত শত মানুষের উৎসুক ভিড়। সবার হাতে মোবাইল ফোন, চলছে ভিডিও। মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাঁপছে আট বছরের একটি শিশু। যে বয়সে রূপকথার গল্প শোনার কথা, সেই বয়সে শত শত মানুষের সামনে তাকে বর্ণনা করতে হচ্ছে কীভাবে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো আদালত নয়, প্রকাশ্য এক ‘সালিসে’ এভাবেই একটি শিশুর সম্ভ্রমের মূল্য নির্ধারণের চেষ্টা করা হলো মাত্র ২০ হাজার টাকা!
বাগেরহাটের কচুয়ায় ঘটে যাওয়া এই অমানবিক ঘটনার ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল, যা দেখে শিউরে উঠছেন বিবেকবান মানুষ।
চকলেটের প্রলোভন ও অন্ধকার সেই মুহূর্ত
ঘটনাটি শুরু হয় গত শনিবার। মাদ্রাসার বিরতির সময় পাশের দোকানে চকলেট কিনতে গিয়েছিল শিশুটি। দোকানদার হাকিম সরদার তাকে ‘দাদা’ বলে ডাকত শিশুটি। সেই আস্থার সুযোগ নিয়ে চকলেট খুলে দেওয়ার নাম করে শিশুটিকে দোকানের ভেতরে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন তিনি। অন্য দুটি শিশু সেখানে চলে আসায় সে যাত্রায় রক্ষা পায় সে। বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে সব খুলে বললে শুরু হয় ‘বিচারের’ নামে এক নোংরা রাজনীতি।
২০ হাজারে সম্ভ্রম বিকিকিনির চেষ্টা!
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় বিএনপি ও ওলামা দল সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীরা মাঠে নামেন। ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা থেকে দূরে সরিয়ে ‘আপস’ করার চাপ দেওয়া হয়। সাবেক ইউপি সদস্য আরিফ হোসেনের যুক্তি ছিল পিলে চমকানো— “মামলা করলে ১০ বছর ঘুরতে হবে, মেয়েটির বিয়েশাদি দিতে সমস্যা হবে। তার চেয়ে কিছু টাকা নিয়ে ফয়সালা করাই ভালো।”
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য ও ওলামা দল নেতা মানফুজুর রহমানের নেতৃত্বে বসে সেই বিতর্কিত সালিস। সেখানে প্রকাশ্যে শিশুর সাক্ষ্য নেওয়া হয়, যা চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এক পর্যায়ে অভিযুক্ত হাকিম সরদার অপরাধ স্বীকার করে সালিসদারের পা জড়িয়ে ধরেন।
সালিস থেকে সংঘর্ষ: পণ্ড হলো বিচার
বিচারের নামে এই নাটক চলাকালেই হট্টগোল শুরু হয়। অভিযুক্তের ছেলে বাধা দিতে এলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। গ্রামবাসী অভিযুক্তকে জুতার মালা পরাতে চাইলে লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালায় একদল লোক। রণক্ষেত্রে পরিণত হয় সালিসস্থল। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলেও মূল অপরাধী হাকিম সরদার এখনো এলাকাতেই বহাল তবিয়তে আছেন।
থমকে গেছে শিশুর শৈশব, মিলছে ভিডিও মোছার হুমকি
এই ঘটনার পর থেকে শিশুটির মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত শিশুটি এখন আর কারও সঙ্গে কথা বলছে না। পরিবার বলছে, প্রভাবশালীরা প্রতিনিয়ত ২০ হাজার টাকা নিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার জন্য চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে, যারা সালিসের ভিডিও করেছিলেন, তাঁদের মেসেঞ্জারে কল ও বার্তা পাঠিয়ে ভিডিও মুছে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না প্রত্যক্ষদর্শীরাও।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সালিস শুরুর আগে ও চলাকালীন পুলিশকে খবর দেওয়া হলেও তাঁরা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কচুয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হারুন অর রাশিদের দাবি, পরিবার অভিযোগ না দেওয়ায় তাঁরা ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। অথচ আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধে সালিস করার কোনো আইনি বৈধতা নেই।
বিচারের নামে এই মধ্যযুগীয় বর্বরতা আর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধীকে রক্ষার চেষ্টা কি তবে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই উৎসাহিত করছে? এই প্রশ্ন এখন পুরো বাগেরহাটবাসীর।
